পাপের শাস্তি ও জবার প্রতিশোধ ( শেষ পর্ব )

0
141

২য় পর্বের পর …

৮। কঠিন বাস্তবতা এবং চরম সিদ্ধান্ত: কিছুদিন ধরে জবা খুব অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে। দাদুর হার্টের একটা ভালবে সমস্যা অপারেশন করতে হয়েছে। অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন দাদা অনেকটা সুস্থ। তবে দাদাকে সেবা করার জন্য চাচা চাচি দাদিকে সব সময় কাছে থাকতে হচ্ছে।

আবার ওদিকে জবার বাবা ও নাকি মাইলড স্ট্রোক করেছে এখন ঢাকার হসপিটালে রয়েছে। শুনে দাদি কান্না করে অস্থির ঢাকায় যাবে জবার তাহের চাচা দাদিকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চাচ্ছিল।

জবা বলল- চাচ্চু তোমার এখন যাওয়ার দরকার নেই। আমি ত এখন বড় হয়েছি। ঢাকা হতে নাটোরে একাই যাতায়াত করতে পারি। আমি দাদিকে নিয়ে আব্বুকে একবার দেখে আসি। আমি আর দাদি চলে আসলে তুমি গিয়ে আব্বুকে দেখে এসো। কারণ দাদা ও এখন ভালভাবে সুস্থ হয়নি তোমাকে এখানে থাকা দরকার। তাহের চাচা বলল-তোর বাবা শুনেছি এখন কিছুটা সুস্থ। তোকে মেডিকেল কোচিং এর জন্য ওদের বাসায় রেখে দিতে চাইতে পারে। পরে হয়ত হোস্টেলে ভর্তি করিয়ে দেবে। ভাইয়ার সাথে সুস্থ থাকতে আমার কথা হয়েছিল ভাইয়া এরকমই বলেছিল। তুই কিছু জামা কাপর বেশি করে নিয়ে যা।

দাদির দিকে তাকিয়ে জবা বলেছিল- দাদি তখন কি করবে? তোর দাদিকে আমি গিয়ে নিয়ে আসব সব সময় ফোন করে ভাইয়া কেমন আছে জানিয়ে দিস নাহলে আমরা চিন্তায় থাকব জবা বলল ওকে চাচ্চু জবা এখন অনেকটাই বড় এইচ এস সি পাস করেছে এ প্লাস পেয়ে বাবা বলেছিল এইচ এস সি পাস করার পরে ঢাকায় ইস্কাটনের বাসায় রেখে অথবা সমস্যা হলে মহিলা  কোনও হোস্টেলে রেখে জবাকে মেডিকেলের কোচিং এ ভর্তি করে দেবে এখন যে অবস্থা দাদা আর আব্বুর কাউকে এসব বেপারে বলা যাবে না। জবার অনেক বান্ধবীরা কোচিং এ ভর্তি হয়ে গেছে মনে মনে দাদা আব্বুর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে হসপিটালে এসে মেজাজটাই খারাপ হয়ে  যায়।

জবা আর জবার দাদী

দাদী জবাকে বলল- দেখেছিস মানুষটা অসুস্থ আর দেখ তার এই অসুস্থতার সময় লায়লাদের বাড়ীর কেউ নেই অফিসের দুইজন মানুষ বসে আছে লায়লার মা ছোট ভাইবোনগুলো ও এখানে এসে থাকতে পারলনা?

লায়লা ও কিছুদিনের ছুটি নিয়ে কামরানের কাছে থাকতে পারত। আমার ছেলেটা কি ওদের জন্য কম করে? জবার ও মনে মনে খুব রাগ হল বুদ্ধি হবার পর’ হতে সে নিজের আপন মায়ের উপর হওয়া জুলুমের কথা সবই শুনেছে।

তার বাবা কামরানের সাথে সৎ মায়ের চক্রান্তের শিকার হয়েই যে জবার আপন মা জরির প্রাণ গেছে তা চিন্তা করলেই মাথা গরম হয়ে যায়। মনে মনে সৎ মা লায়লাকে সে একদম পছন্দ করেনা। তার আপন মায়ের সংসার ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য; নিজের বাবাকে পর করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করার জন্য। কিন্তু বাবার উপর রাগ থাকলেও, সে বাবাকে ভালবাসে কারণ বাবা মরে গেলে একদম এতিম হয়ে যাবে। এছাড়া জবার এইচ এস সি পর্যন্ত পড়ার খরচ তো বাবাই দিয়েছে।

জবা আর মাকে দেখে খুব খুশি হয় কামরান উদ্দিন ভাল হয়েছে তোমরা এসেছ!

দাদি বলে উঠে- লায়লা অথবা লায়লাদের বাসা থেকে কেউ আসেনা ? কামড়ান উদ্দিন বলে -লায়লা রাতে এসে থাকে হাসপাতালে। ছেলেরা নানির কাছে। খাবার নিয়ে আসে রাতে। লায়লার অফিস আছে বেশি সময় থাকতে পারেনা। সকালের খাবার আর দুপুরের খাবার হসপিটাল থেকে দেয়। ওগুলোই খাচ্ছি।ওদের বাসা থেকে পাঠাতে চাচ্ছিল আমি ই বারণ করেছি।আর অফিসের মানুষেরা এসে প্রতিদিন ই অনেকক্ষণ থাকছে।খোজ খবর নিচ্ছে ইঞ্জেকশান স্যালাইন লাগলে এনে দিচ্ছে অফিসের লোকগুলো ।

জবার দাদিকে সালাম দিল দাদা কেমন আছে জানতে চাইল পরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল-এই বড় মেয়ে? খুব ছোটবেলায় দেখেছিলাম।

জবার বাবা বলল- এই আমার বড় মেয়ে জবা আসল নাম কামরুন নাহার।

লোক দুটো বলল- তোমার আব্বু তোমার খুব প্রশংসা করে আমাদের কাছে।

আমি হচ্ছি তোমার লতিফ’ আংকেল তোমার আব্বু আর আমি ছোটবেলার বন্ধু একই অফিসে চাকরি করি আর উনি হচ্ছেন রহীম আংকেল তোমার আব্বু তো সেইদিন বাসায় বসেই অসুস্থ হয়ে পরেছিল।

ভাবি ফোন করে বলল তোমার আব্বুর বমি হচ্ছে, গায়ে জর মাথা ঘুরাচ্ছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে হসপিটালে এনে ভর্তি করে দিলাম এখন ভাল আছে টেনশন করনা কোন ও প্রয়োজন হলে আমাদের ফোন কর।

এই যে আমার ভিজিটিং কার্ড কোন ও প্রয়োজন হলে ফোন দিও।

জবার দাদি বলল – তোমরা কিছু খেয়ে যাও আমি অনেক খাবার নিয়ে এসেছি এসব খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে তোমরা এই দুপুরে কিছু খেয়ে গেলে খুশি হব।

লতিফ আংকেল বলল – খালাম্মা ব্যস্ত হবেন না কামরুল সুস্থ হলে একসময় নাটোরে কামরানের সাথে গিয়ে আপনার হাতের সুস্বাদু রান্না করা খাবার খেয়ে আসব এখন আমরা আসি এই বলে কামরানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা চলে গেল।

ডাক্তারকে আড়ালে নিয়ে জবা জিজ্ঞাসা করে ডাক্তার সাহেব আমার আব্বুর অবস্থা এখন কেমন উনি সুস্থ হবে তো ?

ডাক্তার বললেন- এখন উনি অনেকটাই সুস্থ মাইলড স্ট্রোক করেছিল যেসব ওষুধ লিখে দিব ওইসব ওষুধ ঠিক করে খাওয়াবেন আর উনি  যাতে কিছুতে উত্তেজিত না হয়ে পরেন বেপারটা দেখবেন

ওই দিন জবার দাদি কামরান উদ্দিন যে যে খাবার পছন্দ করে এমন অনেক কিছু রান্না করে নিয়ে এসেছিল জবাকে ওর দাদি বলল – হসপিটালের কোথায় রান্না করা হয় জেনে খাবার গুলো গরম করে নিয়ে আয় দাদু ভাই আমরা সবাই মিলে খাব

জবা খাবার গুলো গরম করে নিয়ে আসার সময় শুনতে পেল জবার বাবা বলছে- লায়লা ইদানীং মাঝে মাঝেই ঝগড়া করে বলে- আমার রনি আর জনির জন্য তো কিছুই রেখে গেলেনা নাটোরের বাড়ীটা ও জবার নামে দিয়েছে তোমার বাবা অন্য বাড়ী তোমার ভাইয়ের নামে এছাড়া মিরপুরের যে বাড়ীটা নিজে বানিয়ে ভাড়া দিয়ে রেখেছ তাও তোমার নামে করে রেখেছ আমার ছেলেরা কি এই পরিবারের কেউ হয়না? জবার বাবা বলেছিল- এসব নিয়ে টেনশন করনা মিরপুরের বাড়ীটা রনি আর জনির নামে করে দেব ভবিষ্যতে।

এছাড়া এই ফ্লাট গুলো রনি আর জনির নামেই হবে ভবিষ্যতে লায়লা ঝগড়া হলে ইদানীং আর ও বলা শুরু করেছে- জবার জন্য ওর দাদা দাদির এত দরদ একটা বাড়ী লিখে দিয়েছে আমার ছেলেদের ঠকাল এখন জবার পড়াশুনার খরচ তারা চালাতে পারেনা?  এইচ এস সি পর্যন্ত তুমিই ওর পড়াশুনার খরচ চালিয়েছ আর কত!  আমার ছেলেদের একটা ভবিষ্যৎ আছেনা ? জবার মা অর্ধ শিক্ষিত ছিল তার মেয়ের এত পড়াশুনার কি দরকার?  বিয়ে দিলেই ত পারে কামরান প্রতিবাদ করে তখন বলে – জবা শুধু জরির ই মেয়ে ছিলনা ও কিন্তু আমার ও মেয়ে। আমার মেয়ে কে আমি পড়াব নাকি বিয়ে দিয়ে দেবো সেইটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছা।আমার তিনটা ছেলে মেয়ে লালন পালন করার সামর্থ্য আছে।তুমি চাকরি করও।তোমার টাকা না নিয়ে ও আমি ওদের মানুষ করার সামর্থ্য রাখি ।জবা কার টাকায় পরবে  তা নিয়ে তুমি নাক গলাবেনা  ।

জবার বাবা আর  ও বলে – লায়লা এরকম অশান্তি আগে করতনা ।ইদানীং এরকম করছে। চাকরি করা মহিলারা ঘরে এসে রান্না করে,  ঘর  সামলায়।আগে লায়লা ওরকম ই ছিল। ইদানীং ঠিক মত রান্না বানা ও করেনা। অনেক সময় সারাদিন অফিস করে এসে ছেলেদেরকে আমিই রান্না করে খাওয়াই। লায়লা সারাক্ষণ মা ভাইবোনদের সাথে বাসায় থাকলে ভিডিও কলে কথা বলে ।এসব অশান্তির ফলে আমার শরীর খারাপ হয়ে গেছে। দাদি কান্না করে বললেন- এজন্য আগেই আমরা তোমাকে সাবধান করেছিলাম লায়লা যে খুব ভাল বউ হবেনা তা আমরা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম তুমি তো আমাদের কথা শুনলেনা  জবা আড়ালে  সব কথাই  শুনতে পেল আর মনে মনে বলল – এই মহিলার শত অপরাধ মাফ করা হয়েছে পুর্বে  আর কোন অপরাধ  মাফ করা যাবেনা দরকার হলে চরম শাস্তি দিয়ে জেলে যাবও কিন্তু এই মহিলার হিংসা অপরাধ  আর মেনে নিবনা এসময় একটু কেশে খাবার গরম করে রুমে এসে ঢুকল , তখন দাদি আর বাবা কথা থামিয়ে সবাই খাওয়া শুরু করল ।জবার দাদি সব শুনে জবার সামনেই বলল – কামরান তোর শরীর যদি খুব খারাপ লাগে তবে তাহেরের সাথে নাটোরে এসে কিছুদিন থেকে যা ।কামরান বলল না আম্মা জবাকে আগে একটা হস্টেলে রেখে মেডিকেল কোচিং এ  ভর্তি করিয়ে দেই।পরে কিছু দিন  নাটোরে এ গিয়ে থেকে আসব।

জবার দাদি বলল – জবা , তুই  চাঁচুকে ফোন দে আগামীকাল এসে যাতে আমাকে আর তোকে নিয়ে যায়।আর আজকে সন্ধ্যায় তোমার বউকে বল আজ ওকে হসপিটালের কেবিনে থাকতে হবেনা। আমি আর জবা এখানে থাকব ।সন্ধ্যায় লায়লা অফিস থেকে এসে জবা আর জবার দাদিকে দেখে খুব অভিনয় করে বলে- আপনার ছেলে এত কাজ নিয়ে বিজি থাকে বেশি কাজের চিন্তা  করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জবা ও জবার দাদি কিছুই বললনা  ।জবার দাদি একসময় লায়লাকে বলল- এত দূর থেকে আসলাম রনি আর জনিকে দেখতে না পারলে খারাপ লাগবে।বউমা একটু রনি আর জনিকে আনার   ব্যবস্থা করও। ওদের জন্য  পিঠা  নাড়ু অনেক কিছু এনেছি।আরেকটা কথা আগামীকাল আমরা চলে যাব ও। আজকে তোমার হসপিটালের কেবিনে থাকার দরকার নেই।আমি আর জবা এখানে থাকব।আগামীকাল তাহের এসে আমাদের নিয়ে যাবে।

সব শুনে লায়লা বলল- কি বলেন আম্মা এত তাড়তাড়ী আপনাদের এবার যাওয়া হবেনা আব্বা তো এখন সুস্থ আমি গতকাল রেহানাকে ফোন দিয়ে জেনেছি আপনি আর জবা ইস্কাটনের বাসায় থাকেন কয়েকদিন আর রায়হান এখন সুস্থ তিন দিন পর ওকে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দিবে বলেছে রনি আর জনি আগামীকাল সকালেই ওর নানার বাসা হতে আপনাদের কাছে চলে আসবে

আপনাদের বরং কস্ট করে হসপিটালে থাকতে হবেনা আমাদের গাড়ীর চালক আপনাদের আমাদের বাসায় নিয়ে যাবে জবা তোমাকে আমি চাবি দিয়ে দেব ও তুমি চাবি দিয়ে দরজা খুলে দাদুকে নিয়ে যে কোন ঘরে থাকতে পার কিছু খেতে ইচ্ছা করলে কিচেনে গিয়ে বানিয়ে খেও দাদি জবা শেষ পর্যন্ত ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে থাকল

এদিকে কুটিল লায়লা কিভাবে জানি ধরে ফেলল কামরানউদ্দিন তার মাকে কিছু বলে দিয়েছে। জবা আর দাদি চলে যেতেই কামরানউদ্দিন কে বলল- কি মা কে পেয়ে মায়ের কাছে আমার নামে বদনাম করে মন টা ভরেছে ?লায়লার কথা শুনে কামড়ান উদ্দিন বলল- না কি যে বলনা !  লায়লা ডাক্তারের সাথে কামরানের অবস্থা কেমন জানতে গেলে ডাক্তার লায়লাকে মাঝে মাঝে বলে আজ ও বলল- ওনাকে কখন ও উত্তেজিত করবেননা। ওনার শরীরের জন্য ভাল হবেনা। আর পারলে ওনার সেবার জন্য কিছুদিন অফিস থেকে ছুটি নিন।অথবা বাসায় ওনার সেবার  জন্য কোন আত্মীয়কে এনে রাখেন ।কিছু দিন বাসায় বিশ্রামে থাকতে বলেন ঠিকমত বিশ্রামে থাকলে উনি ঠিক হয়ে যাবে।লায়লা তার মায়ের সাথে ফোন এ কথা বলে ঠিক করল জবার দাদি চলে গেলে জবাকে মেডিকেল কোচিংএর  ভর্তি করার কথা বলে রেখে দেবে। এখন কামরানকে সুস্থ করার জন্য জবা সবচেয়ে ভাল নার্সিং করতে পারবে  ।লায়লার আর বাসায় থাকতে হবেনা ।আর মেডিকেলের কোচিংএ ভর্তি হলেও মাকে দিয়ে এমন টুকটাক করা হবে যাতে জবা মেডিকেলে ভর্তি হতে না পারে। তাতেও  কাজ না হলে  আরেক প্লান   করে ক্ষতি করতে  হবে।  পড়াশুনা না হলে  জবাকে আর কেউ এত ভালবাসবেনা।রনি ও জনিকেই সবাই আদর করবে ।এছাড়া জবা বেশী কথা বলেনা। মানুষের কাছে কথা লাগায়না। এই সুযোগে ঘরের অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া যাবে। রনি ও জনিকে দেখার দায়িত্ব ও দিয়ে দেওয়া যাবে  ।ওদিকে কামরান মেয়েকে কাছে পেয়ে খুশি থাকবে ।লায়লা নিজে থেকে পরের দিন কামরান কে বলল – কামরান জবাকে আর  নাটোরে’ পাঠীয়ে দেওয়ার দরকার নেই।আমি চিন্তা করে দেখলাম ,তোমার যে অবস্থা তাতে একজন কাছের মানুষ  সব সময় তোমার কাছাকাছি থাকা উচিত ।

এক্ষেত্রে জবা বাসায় থাকলে খুব ভাল হবে ও ঘরের মেয়ে ঘরে থেকে পড়াশুনা করবে।কোচিং এর জন্য আমাদের দুইটা রুম  খালি পরে রয়েছে।নিরিবিলি পরিবেশে ভাল করে পরতে পারবে। বুয়া কেও সন্ধ্যায় না এসে দুপুরের দিকে আসতে বলে দিব।  কামরান বলল – হঠাত করে জবার জন্য এত দরদ ! লায়লা বলল-  ঝগড়া লাগলে হয়ত আমি দুই একটা খারাপ কথা বলি কিন্তু আমি ও জবার ভাল চাই।আর তোমার জন্য এ এখন তোমার মেয়েকে দরকার বলে আমি মনে করি আমি জব না করলে হয়ত ওকে লাগতনা ।আমি তোমাকে ওভাবে সময় দিতে পারিনা।জবা শেষ পর্যন্ত ইস্কাটনের বাসায় থেকেই গেল।  দাদি ছেলে তাহের কে নিয়ে তিন নাতি নাতনি জবা রনি ও জনিকে বিদায় জানিয়ে,  জবাকে আড়ালে নিয়ে বলল – জবা তুই আমার সাথে নাটোরে চলে গেলেই ভাল করতি। তোর বাবা হস্টেলে ভর্তি করিয়ে তোকে নিতে আসলে তখন একেবারে ঢাকায় এসে হস্টেলে উঠতি।খুব ভাল হত।খুব সাবধানে থাকবি। কিন্তু তোকে নিয়ে আমার যত চিন্তা। জবা হেসে দাদিকে সাহস দিয়ে বলল – দাদি তুমি এত চিন্তা করনা তোমাদের জবা কিন্তু এখন আর ওত ছোট জবা নেই ।আমার বয়স এখন সাড়ে সতের।

জবার বাবা সুস্থ হয়ে মেয়েকে বলে- মা তুই না থাকলে এত তাড়াতাড়ী সুস্থ হতে পারতামনা।তোর লাইলা মা  ব্যস্ত থাকে।আবার এই মাস থেকে তোর মায়ের ছুটির দিন আমার ছুটির দিন আলাদা করে দিয়েছে।আমার ছুটির দিন শুক্রবার। আর তোর লায়লা মায়ের ছুটির দিন রবিবার।তোর নিজের পড়ার ফাকে ফাকে রনি আর জনিকে একটু সময় দিয়ে পড়াশুনায় হেল্প করিস।ওরা তোর মত পড়াশুনায় ভাল হয়নি আমাদের মত এমন কি ওর নানা মা পড়াশুনায় ভাল ছিল তাদের মত ভাল হয়নি ।সারাদিন খেলা ধুলা ভিডিও গেমস খেলতে ভালবাসে।জবা ও নিজের পড়ার ফাকে রনি আর জনিকে পড়াত।ওরা দুইজনই এখন ক্লাস সেভেন এ পরে।জবাকে বেশ ভয় পেত। দুইজনেই ঠিক মত পড়তে বসত ।এদিকে জবাকে ওর বাবা মেডিকেল কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিলেন। জবার ক্লাস সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত।জবার বাবা ও অফিস এ যাওয়া শুরু করেছেন আগের মত ।জবা আসার পরে লায়লা ছেলেদের পড়াশুনার  খবর নেওয়া বন্ধ করে দিল। এমন কি রান্না বানা এখন জবা ই করছে ।পড়াশুনার ফাকে ফাকে বুয়া এসে জামা কাপড় থালা বাসন ধুয়ে দেয় আর ঘর মোছে।রান্না  করা জবার জন্য একদিকে ভালই হয়েছে। একদিন জবার বান্ধবীরাই জবাকে কোচিং ক্লাস শেষ হলে গল্প করার সময়  তা বুঝিয়ে দিল।জবা বলল – তোরা হস্টেলে থেকে ভালই করেছিস বেশি বেশি  পড়াশুনা করতে পারছিস।  ঘরে লায়লা মা আগে যেসব দায়িত্ব পালন করত , এখন আমি সেসব দায়িত্ব পালন করছি।এমনকি রনি জনি দের লেখাপড়া রান্না এখন আমি ই করি।দাদা ,দাদি, চাচা ,চাচিদের কাছে থাকতে  রান্না পারলেও রান্না করতামনা দাদি চাচি কাজ ও করতে দিতনা ।

লিপি আর নিপা  শুনে বলে একদিকে রান্না  করে তুই কিন্তু নিজেকে অনেকটাই সেভ রাখতে পারছিস।তোর লায়লা মা আর তোর সৎ নানি যে আমার সৎ মায়ের মত করবেনা তার তো কোন ও নিশ্চয়তা নেই ।আর খারাপ কিছু করতে পারে ।আমার ঘরে ও সৎ মা আমি কিন্তু ভুক্তভোগী। আমার আপন একটা ভাইকে ওই মহিলা নাকি কি খাইয়ে পাগল করে দিয়েছে  ।এত ভাল ছিল লেখাপড়ায় অথচ এস এস সি এর পরে ও  পাগল হয়ে পাগলাগারদে ভরতি আছে এর পর থেকে আর স্বাভাবিক হয়নি। হাতে প্রমাণ না থাকায় আমার নানা বাড়ীর লোকেরা থানায় খবর দিয়েও সৎ মায়ের কিছু করতে পারেনি ।তাই  বাসায় গেলে নিজে রান্না করে খাই।এ কথা তোকে আগে একবার বলেছিলাম।তাই সব সময় চেষ্টা করবি  তোর লায়লা মায়ের অথবা তোর সৎ নানা বাড়ীর হাতের রান্না না খাওয়ার।জবা ভাবল ঠিক ই বলেছে ওরা।  একদিকে রান্না করা ওর জন্য শাপে বর হয়েছে ।এর পর থেকে জবা কখন ও লায়লা অথবা লায়লার পরিবারের থেকে খাবার দিয়ে গেলে খাওয়ার ভান করত ।কিন্তু আড়ালে না খেয়ে নোংরা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিত।

কিন্তু প্রতি রাতে জবাকে নিয়ে আবার সংসারে অশান্তি শুরু করে দিল লায়লা প্রতি রাতে দরজা’ বন্ধ করে লায়লা আর কামরান ঝগড়া এমনকি মারামারি শুরু করল।

প্রথমে লায়লা কামরানের ঘরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে  কান পাতল।

লায়লা বলছিল- তোর আগের ঘরের মেয়েকে দেখার দায়িত্ব  অনেক পালন করেছি। এখন  যা বলছি আমার কথা মত কাজ কর। ও যথেষ্ট বড় হয়েছে  ওকে    বিয়ে দিয়ে দে।শ্বশুর বাড়িতে গেলে শ্বশুর বাড়ীর লোকেরাই ওকে পড়াবে।  আম্মা জবার জন্য একটা ভাল পাত্র দেখেছে ।ছেলে  বি এ পাস করেছে কুমিল্লায় বাড়ী। বিশাল ধণী  পরিবারের ছেলে  ।ছেলের দাদা  এম পি  ছিল।বাবা শিল্পপতি ছেলে  ও এখন  ব্যবসায়ে নেমেছে।  মা ওদেরকে জবার ফটো দেখিয়েছিল ।ওরা পছন্দ করেছে।

কামরান ও চিৎকার করে বলে – আমার মেয়ের জন্য তোদের পাত্র দেখতে হবেনা ।আমি যখন বুঝব তখন মেয়ের বিয়ে দেব।

লায়লা আবার চিৎকার করে বলে- যার মা খুব একটা শিক্ষিত ছিলনা তার এত লেখা পড়া করার দরকার  কী?

এরকম ঝগড়া  চিৎকার চেঁচামেচি মারামারি দেখে জবাও মণে মণে ঠিক করে  ফেলল লায়লা মা কে  সে মেরেই ফেলবে কারণ  সে চিন্তা করল এই মহিলা আমার  মাকে যেমন কেড়ে নিয়েছে এখন  আব্বুকেও পরকালে পাঠানোর  জন্য ঝগড়া  চিৎকার চেঁচামেচি মারামারি  করছে এছাড়া আমার পড়াশুনা শেষ করে দেবার ও চক্রান্ত শুরু করে দিয়েছে অথচ উপর উপর কতই না মেকি দরদ দেখায় আমার আর আব্বুর জন্য !

রবিবার দিনটায়   লায়লা সকাল ১০ টা হতে   দুপুর ৩ টা পর্যন্ত একাই থাকে বুয়া আসে  দুপুর সাড়ে   তিন  টায় জবা ওই সময় কোচিং এ থাকে ৩ টা  সাড়ে  তিনটায়  বাসায় ফেরে  রনি জনি ওই  সময় স্কুলে থাকে দারওয়ান  মামা ও দুপুরের দিকে অনেক সময় গেট   খোলা রেখে নামায পড়তে  যায় অথবা দোকান থেকে কেনাকাটা করতে যায় ঐ সময় যা করার করতে হবে    শুধু সিসি টিভি  ক্যামেরার দিকে তাকান চলবেনা

জবা  রান্না ঘর হতে ধারাল  একটা ছুরি  লুকিয়ে  তার  বই খাতার ব্যাগে  ভরে  এর আগের দিন কাউকে না জানিয়ে    আগের দিন নিউ মার্কেটে যায় নিউ মার্কেট  হতে  কিনে এনেছিল সানগ্লাস,দস্তানা ও বোরকা  ওগুলো ও রেখে দেয় ব্যাগের মধ্যে জবা সকাল দশ টায় কোচিং ক্লাসে  গিয়ে  বান্ধবীদের সাথে দেখা করে দুইটা ক্লাস ও করে আসে যাতে ওকে কেউ  সন্দেহ না করতে পারে ।

কোচিং  এ তানিয়া নামে এক মেয়ে পড়তো ওদের সাথে ।তানিয়ার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল  ওদের  সাথে।তানিয়া প্রতিদিন ওর সাথে    দুই  বছরের   ভাইয়ের  মেয়ে মীমকে  নিয়ে আসত ।বলত-  মীম আমাকে ছাড়া কোথাও থাকতে চায়না।মা বাবা দুই জন ই বিজি জব করে। ওকে  একা রেখে আসা সম্ভব না ।আমার মা  অর্থাৎ মীমের  দাদি   আবার একটু গ্রামে গেছে।মা আসলে মীম কে ওর দাদির কাছে রেখে আসতে পারব ।

জবা  ওই দিন  মীমের জন্য প্লান করেই মিমি নিয়ে আসে। মীমের মুখে  মিমি  লেগে ছিল  দেখে জবা তানিয়াকে বলে ,তানিয়া আমি মীমের মুখ টা পরিষ্কার করে নিয়ে আসি ।

তানিয়া বলে – না থাক আমি যাই ওর মুখ টা  ধুইয়ে দেই  ।

জবা বলে – আমার ও একটু হাত মুখ ধুতে হবে ওকে বরং আমি ই নিয়ে যাই ।এবলে মুখ ধোয়ার কথা বলে বাথরুমে নিয়ে আসে মীমকে। পরে নিজের জামায় ইচ্ছামত পানির ছিটা    দিয়ে জামা কাপড় ভিজিয়ে ফেলে।

বান্ধবীরা দেখে বলে একি অবস্থা কিভাবে হল?

জবা বলে মীম আমার গায়ে পানি ফেলেছে।  থাক,  ছোট মানুষ ।আজ দুটো  ক্লাস করা হয়েছে’। বাকি ক্লাস  করা  হবেনা।বাসায় চলে যাই  ।ক্লাসের বাকী পরা ফোনে জেনে নিব।

ওরা বলল – আচ্ছা কাল ঠিকমত ক্লাস করিস।

জবা  সামনের রাস্তার দিকে হেটে  এক চিপা গলি দেখতে পেল  যেখানে   মানুষ জন  খুব কম  চলাচল করে  গলির দুই পাশে গার্মেন্টস হলেও  গার্মেন্টসের গেট এদিকে নয় ।জবা চারিদিকে খেয়াল করল কেউ ণেই।তারপরে গলীতে ঢুকে মোবাইলের সিম খুলে ফেলল ব্যাগ হতে বের করে সদ্য কেনা বোরকা সানগ্লাস পড়ে   নিল ।বোরকা টায় শুধু চোখ  দেখা যায়। জবা ভাবছে- আমাকে কেউ কখন ও বোরকা পড়া অবস্থায় দেখেনি।আমার যে একটা বোরকা আছে তাও কেউ জানেনা।তাই কেউ কোন সন্দেহ  করবেনা।বাড়ীর কাছে যখন আসল ,  ভাবতে লাগল -দারওয়ান  মামা কখন একটু অন্য কাজে  গেট  খালি রেখে  সরে যাবে ! একসময় জবার ইচ্ছা পুরন হল ।দারওয়ানকে দেখল গেট খালি রেখে দোকানে যাচ্ছে ।এই ফাকে জবা সিসি টিভির দিকে না তাকিয়ে  সিড়ি বেয়ে ৩ তলায় উঠে কলিং বেল টিপলে লায়লা বের হয়ে আসল।

জবাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারলনা বলল – কে আপনি ?

জবা বলল- আমি জবা।

তখন লায়লা দরজা খুলে বলল- ভেতরে আস এই অবস্থা কেন ও তোমার?

জবা ভিতরে এসেই ধারাল ছুরি  লায়লার পেটে ঢুকিয়ে দিল ।লায়লা যেই চিৎকার করতে যাবে লায়লার  হাতে থাকা মোবাইল কেড়ে নিয়ে ,  মোবাইলে লাউড স্পিকারে গান ছেড়ে   দিয়ে,  লায়লার মুখ চেপে  ধরে ধারাল ছুরি দিয়ে  আর ৯/১০  টা কোপ বসিয়ে দিল  লায়লার পেটে।আর বলল- তোর মত খারাপ মহিলার পৃথিবীতে বেচে থাকার কোন ও অধিকার নাই ।

এরপরে জবা দেখল লায়লা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরল ।

জবা  লায়লার নাকের কাছে  হাত নিয়ে দেখল আর দম নেই লায়লার দেহে ।

জবা তাড়াতাড়ি লায়লার চাবি নিয়ে আলমারি খুলে গয়না কাপড় চোপর এলোমেলো করে রাখে। সারা ঘরে কাপড়  চোপড় এলো মেলো করে রেখে , হাত ভাল করে ধুয়ে ছুরি টা রান্না ঘরের আগের জায়গায় রেখে যায়।  গয়না আর নগদ  এক লাখ টাকা নিয়ে দরজা খুলে  দারওয়ানের চোখ ফাকি দিয়ে রিকশা নিয়ে আবার   চিপা গলির কাছে যায় এবং বোরকা    দস্তানা খুলে পলিথিনে ভরে ডাস্টবিনের বাক্সে ফেলে দেয় ।ডাস্টবিনে পলিথিন ফেলার সময়  অনেকে জবাকে দেখে।কিন্তু  পলিথিন  ফেলছে দেখে কেউ তাকে কেউ সন্দেহ করেনি।কিন্তু পুলিশ পরবর্তি সময়ে তদন্ত করতে নেমে পলিথিন  ও ডাস্টবিনের বাক্সের সূত্র ধরে জবাকে আটক করে ।

এদিকে জবা আবার মোবাইলে সিম ভরে নেশাখোরদের খুঁজতে থাকে   যাদেরকে গোল্ডের গয়না আর টাকা দিয়ে দেওয়া যাবে।মনে মনে ভাবে এমন কাঊকে পেলে ভাল হত ! রাস্তা দিয়ে তাই জবা হাটতে লাগল। তবে রাস্তায় এমন কাউকে না পেলে ও এক পাগল দেখতে পেল।পাগলটা ছালা গায়ে ঘুমিয়ে ছিল। রাস্তায় জবা ভিক্ষা দেবার ছলে গোল্ডের গয়না আর টাকা ভিক্ষুকের ছালার ভিতরে দিয়ে দেয়।পাগলটা বুঝতেও পারেনি তার ছালার ভেতর কি দিয়ে গেল মেয়েটি ?

এর পরে যেই রিক্সায় উঠবে অমন সময় জবার বাবা ফোন দিল – জবা তুই কৈ কোচিং  থেকে তাড়া তাড়ী বাসায় আয় সর্বনাশ হয়েছে আমাদের বাসায় নাকি ডাকাত পড়েছে তোর লায়লা মাকে  ডাকাতরা মেরে ফেলেছে ।বুয়া প্রথম গেট   খোলা দেখে ঘর এ ঢুকে দেখে এই অবস্থা ! আমি

রনি জণি কে  স্কুল  থেকে নিয়ে আসছি।জবার মা বাবা ভাইবোন ও এখন চলে আসবে।

পুলিশ এ খবর দিয়েছি ওরা এখনি থানা থেকে চলে আসবে ।

জবা বলে- আমি আসছি বলে জবা দাদা, দাদি , চাচা,  চাচি নানা,  নানি,মামাদের  কে জবাই   লায়লার  খুন হওয়ার খবর  জানাল ।

জবা বাসায় পৌছে দেখে লায়লার মা বাবা ভাইবোন এসে লায়লার  লাশ নিয়ে খুব কান্না কাটি  করছে ।জবার

বাবা ছেলেদের নিয়ে সোফায় বসে কান্না করছে।জবাকে দেখে লায়লার মা তেড়ে এল- ইন্সপ্যাক্টর এ হচ্ছে জবা। লায়লার সৎ মেয়ে।খুব জটিল মেয়ে!  আমার মেয়েকে একদম পছন্দ করতনা। অথচ আমার মেয়ে ওকে নিজের মেয়ের মতই দেখত।ওই খুন করেছে আমার মেয়েকে। ওকে জেলে নিন ।

জবার বাবা রেগে গিয়ে বলল-  হোয়াট   রাবিশ,  আপনার মাথার ঠিক আছে ?  আপনি আমার নাবালিকা মেয়ের উপর  দোষ চাপাচ্ছেন ।

ইন্সপ্যাক্টর বললেন – আপনারা নিজেদের মধ্যে এখন ঝগড়া  করবেননা। ভিকটিমের পোস্ট মর্টেম হবে এবং তদন্ত হবে।

তদন্তেই বের হয়ে আসবে কে আসল খুনি ?

এরকম দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকুন।

এদিকে কামরান সাহেব ছেলে মেয়েদের নিয়ে মিরপুরের বাসায় চলে আসলেন।   যদি ও  রনিই ও জনিকে ওদের নানা বাড়ীর সবাই রেখে দিতে চাচ্ছিল। কিন্তু দুই ভাইই বাবার খুব ভক্ত।  ওরা বাবার কাছেই থাকতে চাইল।তবে বন্ধের দিনে নানা বাড়ী  গিয়ে বেরিয়ে আসে দুই ভাই। এর আগে প্রতি নাসে ভাড়া তূলতে এক বার হলেও নিজের বাড়ীতে আসেন  কামরান সাহেব ।এবার পাকা পাকাপাকিভাবে  থাকতেই চলে এলেন   পুলিশর অনুমতি নিয়ে  ।

পাচ তলায় উপরের ফ্লাট টা স্টুডেন্ট দের কাছে ভাড়া দেওয়া। কামরান সাহেব ওদেরকে সব ঘটনা খুলে বললেন  – তোমরা এখণ ছাদের  রুম দুইটায় থাকবে।তোমরা ছয় জন ওখানে থাকতে পারবে ।ভাড়া  তিন হাজার কম করে দিও। উপরে রান্না ঘর  টয়লেট  আছে।

এখন থেকে এই ফ্লাট তা আর ভাড়া  দিবনা  আমার ছেলে মেয়ে নিয়ে এখানেই থাকতে হবে ।

ছেলেগুলো রাজি হয়ে গেল ।

পোস্টমর্টেমের পর জানা গেল অপেশাদার খুনিই খুন করেছে   লায়লাকে। তখন থেকেই পুলিশ এর সন্দেহ জবার উপর গিয়ে পড়ল।

সিসি টিভিতে  ছাই রঙ এর বোরকা পড়া  রহস্যময়   মহিলার উচ্চতা জবার উচ্চতার সাথে  মিলে যাচ্ছিল যে কিনা লায়লা  খুন  হওয়ার  কিছুক্ষণ  পরেই তাড়াহুড়ো করে  বাসা হতে বেরিয়ে যায়।ওদিকে চুরি যাওয়া  গোল্ডের গয়না উদ্ধার করতে গিয়ে  যেসব চোর দের পাকড়া ও করে ওরা মার খেয়ে বলে দেয় ফার্মগেটের রাস্তায়  এক পাগল ছালা গায়ে দিয়ে  ঘুমায় ।ওখানে ছালার নিচে কে জানি রেখে গেছে? ওই গয়না ও টাকা ওরা পরে চুরি করেছে ।

পুলিশ ফার্মগেটের রাস্তায় ওই দিনের সি সি টি ভির ভিডিও ফুটেজে বোরকা পড়া একই রহস্যময় মহিলাকেই দেখতে পায় যার গায়ে ছাই রঙ এর বোরকা ছিল।

এর পরে জবার  কোচিংএ খোজ নিয়ে জানতে পারে জবা সেইদিন সম্পূর্ণ ক্লাস  না করে বাসায় চলে গিয়েছিল ।এত সব প্রমাণ পেয়ে  জবাকে ধরে থানায় নিয়ে আসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।  জিজ্ঞাসাবাদের  এক পর্যায়ে জবা সব স্বীকার করে  নিতে বাধ্য হয়।  এরপরে ছয় ছয়টা বছর   জবার  জেল  বা কিশোর  সংশোধনী কেন্দ্রে   কাটে ।এই দুঃসময়য়ে  সৎ ভাইয়েরা জবার উপর হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।বাবা লুকিয়ে  সৎ ভাইদের না বলে মেয়েকে দেখতে আসে তাহের চাচার কাছে জবার জন্য টাকা পয়সা পাঠায়   কিশোর  সংশোধনী কেন্দ্রে  মেয়েকে দেখতে এসে  বলে জবা মা তুমি  আমার মেয়ে কখন ও  তোমার টাকা পয়সা প্রয়োজন হলে আমি তাহেরের মাধ্যমে পাঠীয়ে দিব। এখান থেকে বের হয়ে দরকার হয় তুমি বিদেশে গিয়ে  ডাক্তারি পরবে।কিন্তু মিরপুরের বাসায় কখনো যাবেনা। তোমার  দুই সৎ ভাই এখন বড় হয়েছে। পড়াশুনায় তোমার মত মেধাবী না। দুইটাকে    বেসরকারি  বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে হবে।

ওরা এখন তোমাকে খুনি বলে গালি দেয়। তোমাকে অপমান করুক আমি তা চাইনা।

তুমি মিরপুরের বাসায় কখন ও যাবেনা। দরকার হয় আমি তোমাকে একটা ফ্লাট কিনে দেব ঢাকায় তোমার বিয়ের সময়। আর  এখন এখান থেকে ছাড়া পেলে আমি নাটোরে গিয়ে  তোমাকে  দেখে আসব ।

জবা শুনে কষ্ট পেলেও বাবার কথা মেনে নিয়েছে ।

ওদিকে বাবা   গোপনে টাকা খরচ করলেও  দাদা দাদী মামা চাচারা জবাকে ছাড়ানোর জন্য ও অনেক টাকা পয়সা  খরচ করে  মামলা লড়েছিল।  শেষ পর্যন্ত জবার  মুক্তি মেলে ।

জবাকে ওর দাদা নতুন করে মেডিকেল এ ভর্তি করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

এদিকে তাহের চাচার ছেলে জাপান থেকে ভিডিও কলে বলল – জবা আপু তুমি আমেরিকায় এসে পড়াশুনা কর এই ভার্সিটিতে মেডিকেল পড়া যায় তোমাকে আমি কীভাবে মেডিকেল ভর্তির আবেদন করবে বলে দিচ্ছি তুমি ওভাবে আবেদন করবে ওরা অনলাইনে একতা ভর্তি পরীক্ষা নিবে তাতে যদি তুমি টীকে যাও তোমাকে ভর্তির জন্য ওরা সিলেক্ট করে নেবে তোমার এখানে এসে খুব ভাল লাগবে দেখ আপু আর আমি ত আছিই পড়াশুনার পাশাপাশি জব  ও করছি  তুমি ও করবে

জবা বলল- ওখানে পড়তে তো অনেক টাকা লাগবে।

দাদা বলে উঠল – টাকা নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবেনা। তোমার বাবা প্রতিমাসে যে টাকা পাঠায় তা আমি একটা ব্যাংক  তোমার নামে অ্যাকাউন্ট করে এ রেখে  দিচ্ছি আমি ও কিছু টাকা জমিয়ে তোমার জন্য রেখে দিয়েছি  ওই

টাকায় তোমার বিদেশে পড়া ভাল ভাবে হয়ে যাবে তুমি  ভাল করে পড়ালেখা কর যাতে  ওই মেডিকেলে  ভর্তি হতে পার।

জবা সত্যি সত্যিই জাপানের মেডিকেল ভরতি পরীক্ষা দিয়ে টীকে গেল সবাই খুব খুশি।

জবার দাদা, দাদি, নানা, নানি, চাচা, চাচি, আব্বু, মামা নতুন মামিদের নিয়ে এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে এসেছে জবাকে বিদায় দিতে গিয়ে কান্না করছে দেখে জবা সবাইকে বলল দাদা দাদি নানা নানি চাচা।

ও আব্বু তোমরা সবাই কিন্তু একটু অসুস্থ ঠিক মত ওষুধ খাবে মামা মামি তোমরা নানা নানির দিকে খেয়াল রেখ আর আমি ওখানে গিয়ে জব করব পারলে প্রতি বছর ছুটির সময় আমি আর ভাই চলে আসব।

জবা বিমানে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে  মনে মনে বলল-  আমি একদিকে খুব ভাগ্যবতী দাদা দাদি,  নানা,  নানি,   চাচা,  চাচি , আব্বু ,মামারা  আমাকে কত ভালবাসে।নইলে সৎ মা তাকে কবেই ধ্বংস করে দিত !এরকম ঘটনা তো বাংলাদেশে অহরহ ঘটছে !পারিবারিক অশান্তির কারণে কত সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়ে তাদের অসম্ভব মেধা প্রতিভা থাকলেও  পারিবারিক সহযোগিতা বা  সঠিক গাইডের অভাবে  কুসঙ্গে পরে পড়াশুনা ঠিক মত করতে পারছেনা। অকালে ঝরে গিয়ে নেশার জগতে  বা অপরাধ জগতে চলে যাচ্ছে।মামনি সত্যি তোমার জবা  সৌভাগ্যের সন্ধান পেয়েছে।মামনি, তোমার স্বপ্ন পুরন করতে  যাচ্ছি।  তোমার চরম শত্রুকে যেমন চরম শাস্তি দিয়েছি, তেমনি  তোমার  স্বপ্ন  পুরন  করবই।

জবা লেখিকার একটি কাল্পনিক চরিত্র।
ফারজানা শারমিন
সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, কবি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here